সুন্দরবনের ভূত (Ghosts of Sunderban) – Article by Aroop Chaudhuri


see scribd embed

 
 

সুন্দরবনের ভূত

 

অরূপ চৌধুরী

 

দ্বীপময় সুন্দরবন। বাঘ সাপ কুমীরের সঙ্গে প্রতিনিয়ত বাস করা মানুষেরাও বড়ই বিচিত্র। হেঁতাল, বাইন, গরান আর সুন্দরীগাছের মাঝে জোয়ারভাঁটা আর আলোছায়ার সঙ্গে মানুষের মনে জন্ম নিয়েছে বহু বিশ্বাস-অবিশ্বাস, সংস্কার-কুসংস্কার, আর তৎসঙ্গে, ভয়। ভূতে মানুষের ভয়, এমনটাই আমরা জানি। কিন্তু সুন্দরবনে দেখেছি, যদিও প্রচুর ভূতের উপস্থিতি – বনেবাদাড়ে আর মানুষের মনে, ভূতকে ওরা কিন্তু ভয় পায়না। ভূতও আছে, মানুষজনও আছে। এমনকি, কোথাও ভূতেরা বন্ধু পরিত্রাতা, কোথাও বা বিপদে রক্ষাকর্তা। মজাদার রসিক ভূতও আছে।

কৌতূহল বশত, আমি যে সব গ্রামে যেতাম, অবশ্যই ভূতের খোঁজ নিতাম। ধীরে ধীরে ভূতের খবরের সংগ্রহ আমার বেড়ে চলল; দেখলাম, বহু ধরণের অদ্ভুত সুন্দর সব ভূতেরা বাস করে এখানে। বর্ণনা মিলিয়ে আঁকলাম তাদের ছবি। মানুষজন দেখে খুশী হয়ে আরও সাহায্য করল শুধু তাই নয়, কোথাও ভুল হলে শুধরে দিত ছবিগুলো। বর্ণনাগুলো অবশ্য সুন্দরবনবাসীদেরই। ওদের বর্ণনা শুনে কেউ কখনো এর আগে এমন করে লেখেনি বা ছবি আঁকেনি। তাই হুড়োহুড়ি পড়ে গেল আমাকে ভূত যোগান দেবার। সব তথ্যই যে খুব ভালভাবে পাওয়া গেল তা নয়, তবু বেশ কিছু ভূতের হদিশ পাওয়া গেল, যা শুনে মনে হল, যে মানুষের মনের কোলে বাস করা এই প্রাণীরা থাক না চিরকাল জাগরুক হয়ে?

ভূতের কথায় শিশুরা ভয় পায়, আবার মজাও পায়। বয়স্ক মানুষেরা শ্রদ্ধা সমীহ করে; অনেক সময় জেনে বুঝে অন্যায় করা থেকে বিরত হয় এই ভেবে, যে পাছে ভূতে ধরে। ভূত বেঁচে আছে গ্রামীণ আড্ডায়, গল্পে, হেঁশেলে বা পুকুরঘাটে। তাই সুন্দরবনের ঐতিহ্য শুধু বাঘ-কুমীর নয়, ভূত আর তার গল্পেও।

সাহেব ভূত
সাহেব ভূত
শামশের মোল্লা বলেছিল, সে নাকি সুন্দরবনের মাঝ সমুদ্রে এমন ভূত দেখেছে। এরা জাহাজের ডেক-এর ওপর উঠে দাপাদাপি করে। আবার অকস্মাৎ জাহাজ থেকে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কারও ক্ষতি করেছে – এমনটা শোনা যায়নি। হারউড-পয়েন্ট অঞ্চলে অনেকে সাহেব ভূত দেখেছে বলে শুনেছি। জলদস্যুদের হাত থেকে জাহাজকে রক্ষা করে বলে বিশ্বাস। মানুষের সমীহ পায়।
নেতিধোপানি থেকে আমলাবেতি গ্রাম। সর্বত্রই আমি “হাওয়ার” কথা শুনেছি। সারা বছরই হাওয়ার দাপট থাকে। কোন নির্দিষ্ট আকার বা বর্ণনা পাওয়া যায় না। শুধু সবাই জানে, হাওয়া তার লম্বা চুলদাড়ি দিয়ে সব এলোমেলো করে যায়। কারো ক্ষতি করে না। হাওয়া-কে গ্রাম দেশের মানুষ মান্য করে। অনেক সময়, হাওয়া মানুষের উপকারও করে। তবে, হাওয়ার প্রভাবে বহু সময় ছোটদের, এমনকি বড়দেরও অসুখ করে। গ্রামের গুনিন ওঝারা তাই হাওয়া কাটাতে ঝারফুক করে। হাওয়া
হাওয়া
হাঁড়ি ভূত
হাঁড়ি ভূত
গোসাবা অঞ্চলে অনেকেই বিশ্বাস করেন যে হাঁড়ি ভূত হাঁড়িতে চড়লে তার কপাল খারাপ। চাল ডাল যা-ই বসাওনা কেন, নিমেষে পুড়ে খাক হয়ে যাবে। জল বসালে হাঁড়ি ফুটো হয়ে উনুন পর্যন্ত নিভে যায় – হাঁড়ি ভূতের অত্যাচারে। তাই ভূতে চড়া হাঁড়িতে দুধ জ্বাল দিয়ে সেই দুধ কুকুরকে খাওয়াতে হয় – তবেই নাকি ভূত ছাড়ে। অন্যথায় হাঁড়ি ভেঙ্গে সমুদ্রে ভাসানো ছাড়া গতি নেই। গোলগাল মুখ, ছোট-বড় দু’টি কান বালা; ওপরে পাটিতে একটা, নিচে তিনখানা দাঁত। খাড়াখাড়া চুল, হাঁ করে শুধু খেতে চায়। ভাসমান অবস্থায় কখনো আবার ডিগবাজিও খায়। সর্বদাই উর্দ্ধদৃষ্টি।
পেঁচা নয়। এর নাম পেঁচো। দেখতে বড়সড় ভুতুম পেঁচার মতন। কান আছে। কিন্তু পা দু’খানা অনেকটা মানুষের মতন, আর গায়ে সাদা কাপড় জড়ান। চুপচাপ শান্ত হয়ে বসে থাকে। দেখলে কেউ বলবে না যে পেঁচো কি সাঙ্ঘাতিক জিনিষ। লোকে বলে – “পেঁচোতে পেয়েছে”। যাকে ধরে তার দফারফা শেষ করে দেয়। মনে পরে, ছোট বেলায় আমার মায়ের মামা – ভুলুদাদুর রাজপুরের বাড়িতে, কুটিল দাসি নামে এক ঝি কাজ করত। তার স্বামী ছিল গুনিন। মন্ত্র বলে ভূত, অপদেবতা আনতে পারত। সে পেঁচো নামাত, মানে কাউকে পেঁচোতে ধরলে, মন্ত্র বলে পেঁচো তাড়াত।
সুন্দরবনের পেঁচো তাড়াবার কেউ আছে কিনা জানি না। তবে, পেঁচোয় ধরা মানুষ দেখেছি। তারা খুব নোংরা হয়, আর কুঁড়ের বাদশা। গায়ে গন্ধ, তবু চান করবে না। ভাত খেয়ে, বিছানায় এঁটো হাত মুছে রাখবে। আর সারা দিন শুধু বসে ঝিমোবে। মাঝে মাঝে মাথা নাড়বে আর উদাস চোখে চেয়ে থাকবে। প্রচলিত বিশ্বাস মেনে, পেঁচোর ঘরে নিম হলুদ পাতা ঝুলিয়ে রাখা, শুকনো লঙ্কা পোড়া দেওয়ার রেওয়াজ আছে।
পেঁচো
পেঁচো
লিক্‌পিকে ভূত
লিক্‌পিকে ভূত
নরম, লিক্‌পিকে, কিছুটা ভেজা। ধরতে গেলে সরাৎ করে পিছলে যায়। মাথাটা চ্যাপ্টা, তিনকোণা। যখন তাকায়, একটা চোখ খোলে, অন্যটা বন্ধ করে রাখে। মাথায় বখাটে ছেলেদের মত চুল, মুখে ব্যাঁকা হাসি – যেন ও ছাড়া আর সকলেই ভুলে ভরা। সরু লম্বা শরীরটা গাছের ডালে জড়িয়ে নিশ্চুপে ঝিম মেরে পড়ে থাকে। মানুষকে অপ্রস্তুত করতে ওস্তাদ। লম্বা লেজের মাথায় যে লোম আছে, সেগুলো দিয়ে মুখে ঘাড়ে আচমকা ঝাপটা বা সুরসুরি দিয়ে লোককে ঘাবড়ে দিতে ওস্তাদ। নতুন জামাই বা বরযাত্রীদের নাকি বহুবার থতমত খাইয়ে ছেড়েছে এই ভূত। এমনটাই বললেন বিধবা পল্লীর সনাতনী মাসিমা।
কথাটা আসলে নাটু বা নাটা। মানে, বেঁটে। সুন্দরবনের লোকেরা “ন” কে বহুসময় “ল” বলে। তাই লোকমুখে নাটু – লাটু হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাথাটা গোল। টাকে সামান্য দু’চারগাছা চুল। কিছু না বুঝেই বোকার মত হাসে। গায়ে মাকড়সার মত জাল বোনা। হাতে, পায়ে চারখানা মাত্র আঙ্গুল। তাও আবার টিকটিকির মতন। দেয়ালে বা ছাদে উল্টো হয়ে ঝুলতে দেখা যায়। পা বেঁটে। গাঁটে, গাঁটে ফোলা। যখন তখন যেখানে সেখানে হাজির হয়ে গোলমাল বাধায় ও হাসে। কোন মানুষকে যখন লটু ভূত ধরে, লোকে বলে লটুতে পেয়েছে। লটু
লটু
গোল্লু
গোল্লু
গোল গাল মুখখানা। মাথা ও কপাল ছোট। চুল অতি সামান্য। কিন্তু, মুখ খানা বেশ ভারী আর তিনকোনা। চোখ ছোট। গালে প্রচুর বলিরেখা। তরমুজের মত বড়সড় মাথাখানা ভাসতে ভাসতে আসছে। তবে তা উল্টো হয়ে। সাধারণত মাঝ রাতে এরা আসে। এর দেখা পেলে, ভয় লাগবেনা এমন প্রাণী কে আছে? শুনেছি কুকুররা নাকি গোল্লু আসার আভাস পায়। মুখে অনবরত বু-বু-বু আওয়াজ করে চলেছে। গোল্লু খাবার খেতে চায়। ওর পেট নেই। তবু খুব ক্ষিদে। তাই গোল্লু ভূত বাড়িতে এলে মানুষ তাড়াতাড়ি খাদ্য যা থাকে তাই উঠোনে বার করে দেয়। খেয়ে খুশি গোল্লু বর দিয়ে যায়। তার বরে মানুষের বিপদ কাটে। গহন সুন্দরবনে, গোল্লু সাধারণ মানুষের সঙ্গী হয়ে আজও বেঁচে আছে।
পুকুরে দুটো ডাব ভাসছে। কেউ ভাবল গাছ থেকে পড়েছে। ধরতে গেল। অমনি ডাব দু’টো সরাৎ করে ডুব মারল। এর নাম পানু-মানু। জোড়া ভূত। তবে সবাই দেখতে পায় না। মানুষ কে ভুল বোঝাতে ওস্তাদ। গ্রাম দেশের বাচ্চারা পানু-মানুর হাতে পড়লে আর রক্ষা নাই। কিন্তু, ভূত বলে অবহেলা কোর না। স্বামীর আর শাশুড়ীর সাথে গোলমাল করে, গ্রামের বউরা পুকুরে ডুব মেরে আত্মহত্যা করতে গেলে, পানু-মানু তাদের বাঁচায়। ডুবতে দেয় না। আবার, অনেক সময়, গরিব মানুষেরা পুকুরের পাশে বসে অভাবের জ্বালায় কাঁদতে থাকে। পানু-মানু তখন জলের তলা থেকে বাসন তুলে তা ভাসিয়ে দেয়। যে পায়, সে পানু-মানুকে আশীর্বাদ করে বাড়ি যায়। পানু-মানু
পানু-মানু
চুপড়ি
চুপড়ি
কোন ছায়া বা কায়া নয়। নয় কোন অদ্ভুত শব্দ। স্রেফ নিঃশব্দে পাশে এসে দাঁড়ায়। মনে কর, কোথাও বসে কথা বলছ। বা রাস্তায় দাঁড়িয়ে। কখন যে কে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, বুঝতেও পারনি। শুধু আঁশটে গন্ধ পেলে, যেন মাছের ঝুড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছ। বড় অপ্রস্তুত অবস্থা। ক্রমশ তীব্র হচ্ছে গন্ধ। গা গুলিয়ে উঠছে। বমি পায় পায় অবস্থা। কি করবে ভাবছ। তখনি শুনলে ফিক্‌ করে হেসে কেউ সরে গেল। এরই নাম চুপড়ি। কোমর পর্যন্ত আছে। বাকিটা নেই। কোমরে চুপড়ি বা ঝুড়ি। তাতে মাছ আছে। তবে তা বাসি বা পচা। যারা চুপড়ি দেখেছে, তারা বলে যে ওর পা দুটো আছে কিন্তু নেই। মানে ছায়া, ছায়া। চুপড়ি, দিনে দুপুরে বা রাতেও দেখা যায়। তবে কার কোনও ক্ষতি করে না। হাঁটুর ওপর সাদা কাপড় পরে, ওরা ঘুরে বেড়ায়। সঙ্গী ঐ আঁশঝুড়ি।
আবারও সেই ল-ন এর সমস্যা। এর নাম লম্বা। লোক মুখে হয়েছে – নাম্বা। আমার সহকারী পরিতোষবাবুকে একবার নাম্বায় ধরেছিল। তার-ই মুখে শোনা। “রাস্তা দিয়ে ভর দুপুরে যাচ্ছিলাম শ্বশুর বাড়ি,” বলে চলেন পরিতোষ। “হঠাৎ দেখি আমার পেছন পেছন কে যেন একজন লম্বা মতন মানুষ আসছেন। রাস্তা দিয়ে তো কত লোকে যাতায়াত করে। তাই বিশেষ মনযোগ দিই নি। তবু সাধারণ অভ্যাসবশত, একবার পিছনে ফিরে দেখেছিলাম। কিন্তু কাউকে না দেখে, সোজা এগিয়ে গিয়েছি, ও নিয়ে আর ভাবিনি।
কিছু পর মনে হল কে যেন আমাকে টপকে যেতে চাইছে। তার দীর্ঘ ছায়া আমার ছায়ার ওপর বার বার পড়ছিল। এবার একটা চাপা অস্বস্তি। সরে দাঁড়ালাম। যে পেছনে আসছে, তাকে পথ করে দেবার জন্যে। কিন্তু কেউ গেল না। ছায়াহীন রাস্তায় আমি একা দাঁড়িয়ে। বাড়ি ফিরে এল বেশ জ্বর। সে জ্বরের ঘোর আর কাটে না। নানা রকম অদ্ভুত কথা বলেছিলাম জ্বরের বিকারে। বাড়ির মানুষজন শুনেছেন যে আমি – এই পরিতোষ, যে নাকি কোনদিন সংস্কৃত পড়িনি, বিশুদ্ধ উচ্চারণে ওই জ্বরের মধ্যে চণ্ডী আবৃত্তি করে গেছি! ওর কথা অবিশ্বাস করতে পারিনি, কারণ কানু ময়রা, যে নাকি ওর জ্বরের সময় বরফ দিয়েছিল, তার কাছেও একই কথাই শুনেছি।
নাম্বা
নাম্বা

অলঙ্করণঃ অরূপ চৌধুরী



download


4 thoughts on “সুন্দরবনের ভূত (Ghosts of Sunderban) – Article by Aroop Chaudhuri

  1. কি মজাদার লেখা। ভূতকে নিয়ে এত কথাও হয়! মনে পড়ছে বিখ্যাত সেই ভূতদের– সোজা ভূত, বাঁকা ভূত, রোগা ভূত, মোটা ভূত, আরো কত ভূত যে আছে।

  2. দুর্দান্ত একটা লেখা। আর আঁকাগুলো এটার আকর্ষণ ১০০গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *