চেনা পথ, অচেনা কথা – Travelogue by Indira Mukerjee


see scribd embed

 
 

চেনা পথ, অচেনা কথা

 

ইন্দিরা মুখার্জি

 

1

বিদায়ী ফাগুনের গায়ে তখন চোখঝলসানো চৈতী আগুন, কিন্তু ছুটির অমোঘ আকর্ষণ আমাদের নিয়ে বেরিয়ে পড়ল দোলের আগের দিন, ভোরে, খড়গপুর থেকে বোলপুরের পথে… “তোমায় নতুন করে পাবো বলে”। দেখা হয়েছে বহুবার চোখ মেলে, তবুও ঘর থেকে দু’পা ফেলেই আবার হাঁটি চেনা পথে, আবার নতুন করে আবিষ্কার করি গ্রামবাংলাকে। পথের আকর্ষণে বেরিয়ে পড়ি বারবার, কালের গাড়ি আরোহণ করে। লিখে চলি পথের পাঁচালী। ভোর ৬’টায় শুরু করি যাত্রা, সঙ্গে এক থার্মোস চা, কিছু কুকিস, মাফিন আর কয়েকটা কচি শশা নিয়ে।

এবার আমরা গেছিলাম বীরভূমের দুবরাজপুরে, সত্যজিৎ রায়ের অত্যন্ত প্রিয় একটি শুটিংস্পটে। মামা-ভাগনে পাহাড় এবং হেতমপুর রাজবাড়ি দেখতে। গুপী গাইন বাঘা বাইন, হীরক রাজার দেশে আর অভিযানের শুটিং হয়েছিল এই দুটি জায়গায়।

পূবের আলোয় ন্যাশনাল হাইওয়ে ৬০ ধরে পশ্চিম মেদিনীপুরের পথে একে একে পড়ল সারি সারি শালগাছ অধ্যুষিত গ্রাম, মেঠোপথের ধারে সাতকুই বাজার। এসে গেল কংসাবতী নদীর ওপর বীরেন্দ্র সেতু। আজ কংসাবতী “কাঁসাই” হয়েছে। একে শীত সবে মাত্র বিদায় নিয়েছে। তাই চোখের কোলে কালি ঢালা। শুকনো তার বালির চর। মধ্যে মধ্যে পায়ের গোড়ালি ডোবানো জলের রেখা একেঁবেঁকে চলে গেছে বহু দূরে। এভাবে ১৫ কিলোমিটার চলার পর‌ই শহর মেদিনীপুরের গায়ে ধর্ম’র মোড়। ধর্ম থেকে স্টেট হাইওয়ে ৭ ধরলাম; আরো ২০ কিলোমিটার পর কেশপুর এবং স্টেট হাইওয়ে ধরে ১৯ কিলোমিটার চলার পর চন্দ্রকোণা। কেশপুর যেতে যেতে পথে পড়ল পাঁচখুরি চক, বগছড়ি গ্রাম।

সকালের মিষ্টি রোদ এসে পড়েছিল তখন শালবনের মাথায়, বসন্তের কচি সবুজ পাতায়। চেনা পথ যেন আরো নবীন সজীবতায় ভরে উঠছিল। সজনে গাছ তার ভর-ভরন্ত রূপ নিয়ে, চিরুনির মত ঝাঁকে ঝাঁকে ডাঁটা ঝুলে রয়েছে তার গায়ে মাথায়।

বসন্তের মোরাম-রাস্তায় পলাশের কুঁড়ি, আমের মুকুল, বাদাম গাছের পাতাঝরা গুঁড়ি দেখে সেই পলাশ ঝরা সকালে মনে হল

2


শিমুল-তলায় মেয়ের বাড়ি, পলাশ-উঠোন ভরা
অশোক-দালান পেরিয়ে পাবে কৃষ্ণচূড়ার সাড়া,
সজনেফুলের গন্ধ বাতাস, শিমুলরাঙা মাটি
পলাশবৃষ্টি মেঘের বাড়ি, রঙীন ধূলোমুঠি!

কবিতার খাতা নিয়ে ঝুঁকে পড়েছি তখন; শিমুল-বারান্দা তখন স্বপ্নময়। মনের ধারাপাতে তখন কেবল বসন্ত।


সেদিনও ঝরেছে একমুঠো পলাশ,
কমলা রঙের পলাশ, বাদামী তার বোঁটা,
পাতা ছিল না একটাও তার আশেপাশে।
ভাবনার পাতা উলটে চলেছি একে একে…
পলাশ ঝরেছিল কার্নিশে,
কমলা রঙের পলাশ, বাদামী তার বোঁটা,
উঁকি দিয়ে চলে গেছিল
বসন্তের একচিলতে রোদগোলা সকাল।

3

পড়ল মুগবসান বাজার, নেড়াদেউল গ্রাম। খড়গপুর থেকে এতক্ষণ সোজা উত্তরদিকে যাচ্ছিলাম। চন্দ্রকোণা পেরিয়ে পূবদিকে ঘুরলাম। বাঁদিকে পড়ল ক্ষীরপাই। কুঁয়াপুর গ্রাম, দক্ষিণ বাজার পেরোলাম। চন্দ্রকোণার কাছে গোঁসাইবাজারে পড়ল বিষ্ণুপুরের আদতে তৈরী পোড়ামাটির অপূর্ব এক মন্দির ও তার ধ্বংসাবশেষ।

হালদারদীঘি গ্রাম, হাসপাতাল চক। এ যেন পুকুর-সর্বস্ব গ্রাম। দীঘিভরা সবুজ জল তখন টলোমলো প্রতিবিম্বে। পড়ল জাড়া, শ্রীনগর, রামজীবনপুর আর তারপরই রামকৃষ্ণদেবের স্মৃতিবিজড়িত কামারপুকুর।

ফেকোঘাট থেকে ডান দিকে ঘুরে আরামবাগের রাস্তায় আমরা নিলাম প্রথম হল্ট, ধূমায়িত চা আর মাফিন দিয়ে ব্রেকফাস্ট সারলাম। আবার শুরু পথচলা। দ্বারকেশ্বর নদী পেরোতে হল। পড়ল মফস্বল শহর বুলচন্দ্রপুর, উচালন, শেহারাবাজার।

4

দামোদর নদীর ওপর কৃষক সেতু পেরিয়ে, ছোটবড় কালোদীঘির জলকে সরিয়ে রেখে আমরা বর্ধমান শহরের গা দিয়ে ন্যাশনাল হাইওয়ে ২ ধরে কিছুটা গিয়েই ন্যাশনাল হাইওয়ে ২৮ যা গিয়ে ছোঁয় ১০৮ শিবমন্দির। শেরশাহসুরীর গ্র্যান্ডট্র্যাঙ্ক রোডের বিশাল রেলওয়ে ট্র্যাকের চারলাইনের লেভেল ক্রসিং পথ আটকালো কিছুক্ষণ।

তারপর আবার খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে। তালপুকুর, তালদীঘি পরিবেষ্টিত গ্রামবাংলা এবার চলল সাথে সাথে।

5

বর্ধমান জেলাকে কেন “গ্র্যানারি অফ ওয়েস্টবেঙ্গল” বলে তা বুঝলাম। পথের ধারে মরাই ভরা ধান, গ্রামের চালাঘরের পাশে বিশাল ধানের গোলা যেন পৌষপরবে ভুরি ভোজ খাইয়েও অফুরান। মনে হল,


ওগো আমার, আমার গাঁয়ের, রাণীর গায়ের সোনা
দুচোখ ভরে দেখব সোনা, সোনার তুমি হাতে গোনা

6

ভাবনার খেয়া ব‌ইতে ব‌ইতে অজয়নদীর ওপর অবনসেতু এসে গেল। বর্ধমানের হাত ধরে বীরভূমে পা দিলাম। নূরপুর গ্রাম এল। তখন ঘড়িতে এগারোটার সূয্যি। কিছুপরেই বোলপুর। দুপুর সূর্যকে মাথায় রেখে কবিগুরুর কর্মভূমিতে, ছাতিম, শিমুল, পলাশের শহর শান্তিনিকেতনে আর তারপরেই প্রান্তিক পৌঁছলাম। চেনা পথ, অচেনা আনন্দে ভরে ওঠে বারবার। বোলপুরের প্রকৃতির রঙ এক এক সময় এক এক রকম। ফুলের বৈচিত্রে, পাতাবাহারের রঙিনতায় গ্রামবাংলার এই রাঙামাটি বোধহয় একসময় কবিগুরুকে আকৃষ্ট করেছিল। আর শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী না থাকলে সাধারণ মানুষ এই অঞ্চলের প্রতি টান অনুভব করত না। দু’দিন ছুটি চাই শুধু।

7

হাওড়া থেকে গণদেবতা, শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস, শহীদ এক্সপ্রেস, ইন্টার সিটি এক্সপ্রেস, বিশ্বভারতী এক্সপ্রেস, আর সরাইঘাট এক্সপ্রেস; এই এতগুলি ভিন্ন সময়ের ট্রেন আছে বোলপুর বা প্রান্তিক পৌঁছবার জন্য। আর কোনো অপরিকল্পিত ছুটির পিকনিক হলে গাড়ি নিয়ে সদলবলে বেরিয়ে পড়লেই হল। শেরশাহ সুরীর মধ্যযুগীয় রাস্তার ওপর ইংরেজ তৈরী করেছিল গ্র্যাণ্ড ট্র্যাঙ্ক রোড এবং সেটিকে এনএইচ-২ আখ্যা দিয়ে ভারত সরকার গোল্ডেন কোয়াড্রিল্যাটারালের কোলকাতা দিল্লী শাখা তৈরী করে। বর্ণালী-চতুর্ভুজ-সড়ক-যোজনার সার্থকতায় ভ্রমণের আনন্দ ছাপিয়ে যায়। মনে হয় কে বলে বাংলা আমার নিঃস্ব? মানুষ রীতিমত টোল ট্যাক্স দিয়ে গাড়িতে ভ্রমণ করছে এখন। ধন্যবাদ বিশ্বায়ন! ন্যাশানাল হাইওয়ে অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (NHAI) মেন্টেন্যান্স করছে! ধন্যবাদ NHAI! চারলেনের রাস্তায় স্রোতের মত নিয়ম মেনে গাড়ি চলছে ঠিক বিদেশের মত; মাঝখানের ডিভাইডারে দৃষ্টিনন্দন বোগনভেলিয়া, করবী আর কলকে ফুলের বাতাসীয়া দোলা দেখে কৃতজ্ঞতা জানাই NHAI ইঞ্জিনিয়ারের রুচিশীলতাকে।

গাড়িতে যাবার কথা বললাম এই কারণে। আর বললাম এভাবে গেলে কোনো প্ল্যান ছাড়াই বেরোনো যায়। ট্রেনের টিকিট কাটা, স্টেশন যাওয়া, সময় মত ট্রেন ধরার হ্যাপা নেই। আর ব্যস্ততার জীবনে হঠাৎ মনে করলেই বেরিয়ে পড়া যায় এইসব কাছেপিঠের জায়গায়। কোলকাতা থেকে গাড়ি করে গেলে বোলপুর পৌঁছতে সময় লাগে মাত্র সাড়ে তিন ঘন্টা। ভোর-ভোর বেরুলে অনেকবার ঘন্টা তিনেকের মধ্যেও পৌঁছে গেছি। মাঝে শক্তিগড়ে দাঁড়িয়ে প্রাতরাশ সেরে নেওয়া যায় গরম কচুরি আর চা দিয়ে। এন এইচ-২ ধরে সোজা যেতে হবে পানাগড় অবধি।পানাগড়ের ভাঙা ট্রাকের সারি পেরিয়ে তারপর ডান দিকে পানাগড়-মোরগ্রাম হাইওয়ের বাঁকে ঘুরে, অজয় নদী পেরিয়ে, শাল, সোনাঝুরি, ইউক্যালিপটাসের জঙ্গল। ইলামবাজারের ঘন জঙ্গলমহল। এতসব যারা কলকাতা থেকে যাবেন তাঁদের উদ্দেশ্যে বলা হল।

শিল্পায়নে ব্রতী হয়ে আমরা “অরণ্যমেধ” যজ্ঞে সামিল হয়েছি, তবুও বাংলার সবুজ এখনো যা আছে তা অনেক রাজ্যের ঈর্ষা আর আমাদের গর্ব। তারপরেই কবিগুরুর কর্মভূমিতে, ছাতিম, শিমুল, পলাশের শহর শান্তিনিকেতনে।

শ্রীনিকেতন, বিশ্বভারতীর আশ্রম পেরিয়ে রতনপল্লী, বনপুলক, শ্যামবাটি, তালতোড়কে সরিয়ে রেখে দুপুর সূর্যকে মাথায় নিয়ে বোলপুর বা প্রান্তিক পৌঁছে সেরে নেওয়া যেতে পারে দুপুরের খাওয়া। বোলপুর বা প্রান্তিকে অনেক হোটেলে আছে থাকার ব্যবস্থা। কলকাতা থেকে বুক করে এলেই হল।

শ্যামবাটির মোড়ে সেচ দপ্তরের ক্যানালের জল বয়ে চলেছে। ভরা বর্ষায় এই জলের অমোঘ আকর্ষণ আমাকে আরো টানে। প্রতি শনিবারে ক্যানালের ধারে খোয়াইয়ের হাট বসে। এটি আর কোথাও দেখিনি। সূর্যাস্তের ঠিক ঘন্টা দুয়েক আগে থেকে বসে এই হাট। কত শিল্পীরা নিজ নিজ শিল্পের পসরা সাজিয়ে বসেন সেখানে, আর সাথে থাকে বাউলের গান। রাঙামাটির পথ ধরে আমরাও পৌঁছে যাই সেখানে। ডোকরার গয়না, কত রকম ফলের বীজ দিয়ে তৈরী গয়না, কাঁথার কাজের বাহার, পটশিল্প, বাউলগানের আনুষাঙ্গিক বাদ্যযন্ত্র, তালপাতা, পোড়ামাটির কাজ, বাটিকের কাজ, আরো কত কিছু এনে তারা বিক্রি করে। কিন্তু অন্ধকার হবার পূর্বমুহূর্তেই পাততাড়ি গোটাতে হয় তাদের। সোনাঝুরির ছায়ায় প্রান্তিকের বনবীথি যেন ঘুরে ফিরে নতুন করে ধরা দেয় আমার কাছে।

প্রান্তিকে সে রাতটা থেকে পরদিন সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে বেরুনো হল মামাভাগনে পাহাড় ও হেতমপুর রাজবাড়ির উদ্দেশ্যে।
প্রান্তিক থেকে সোজা খোয়াইয়ের পথ ধরে শ্রীনিকেতনের দিকে ইলামবাজারের জঙ্গলের পথ। ইলামবাজার থেকে একদিকে পানাগড়ের রাস্তা। সেদিকে না গিয়ে আমরা দুবরাজপুরের রাস্তা ধরলাম। দুবরাজপুর থেকে আরো ১২ কিলোমিটার গেলে পড়বে বক্রেশ্বর… যেখানে সতীর “মন” পড়েছিল।

এই জলাধারটি বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুত কেন্দ্রের জল সরবরাহ করে। এবার আসি বক্রেশ্বরের মাহাত্ম্যে। “বীরভূমের মাহাত্ম্য” বইটিতে বলা গল্প অনুযায়ী (মহাভারত অবশ্য অন্য কাহিনী বলে), সত্যযুগে লক্ষ্মী-নারায়ণের বিবাহের সময় ইন্দ্র সুব্রত নামে এক মুনিকে ভীষণ অপমান করেছিলেন। যার ফলে সেই সুব্রত মুনির শরীরে আটটি ভয়ংকর ভাঁজ পড়ে যার জন্য তাঁর নাম হয় “অষ্টাবক্র” মুনি। এই অষ্টাবক্র মুনি বহুদিন শিবের তপস্যা করার পর শিবের আশীর্বাদে মুক্তি পান। তাই এই বক্রেশ্বর শিব খুব জাগ্রত। এখানে দশটি উষ্ণ প্রস্রবণ আছে যাদের জল গড়ে ৬৫ থেকে ৬৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সতীর “মন” বা ভ্রুযুগলের মধ্যবর্তী অংশ পতিত হয়। আপাত অনাড়ম্বর মহিষমর্দিনী মায়ের মন্দিরে দাঁড়ালে বেশ ছমছমে অনুভূতি হয়। আর সাথে বক্রেশ্বরের শিবমন্দিরটিও দেখে ঘোরা যায়। বক্রেশ্বরের উষ্ণপ্রস্রবণে স্নানের ব্যবস্থাও আছে।

8

ইলামবাজারের জঙ্গলের পথে লম্বা লম্বা শাল-সোনাঝুরি-ইউক্যালিপটাস গাছগুলো যেন গাড়ির সাথে আপেক্ষিক গতিময়তায় চলতে শুরু করে। ইলামবাজার জঙ্গল পেরিয়ে ইলামবাজার পৌঁছে ডানদিকে ঘুরে সুপুর গ্রাম পেরিয়ে পড়ল দুবরাজপুর। বসন্তের সবুজ কচিপাতায় ভরে গেছে গাছ, আর চৈতী হাওয়ায় মাতাল প্রকৃতি। ডাঙায় সবুজ ধান, পুকুরের জলে গ্রামের চালাঘরের ঠান্ডা ছায়া, ধানের গোলার ছায়া, তালগাছের ছায়া। নীল আকাশের চাদরে শিমুল, মাদারফুলের লাল লাল ছাপ, মধ্যে মধ্যে অশোকের কমলা কুঁড়ি। দুবরাজপুর কামারশালের মোড় পেরিয়ে দুবরাজপুর সিভিল আর ক্রিমিনাল কোর্ট, থানা, মিউনিসিপালিটি আর তারপরই রাজবাড়ি। সেখান থেকে এক কিলোমিটার গেলে পড়বে মামা-ভাগনে পাহাড়।

9

নীল এক আকাশের নীচে একসাথে কত কত জীবন্ত পাহাড়ের শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান। কত কত পাথর, নানা আকৃতির কত কত নাম না জানা পাহাড় হয়ে উঠেছে সেগুলো। কোনোটি সূর্যের কাছ থেকে ঢেকে রেখেছে নিজেকে। কেউ আবার চাঁদের মোমজোছনায় ভিজবে বলে সকলের থেকে আলাদা করেছে নিজেকে। কোনটির গায়ে হেলে পড়েছে সজনের ডাল, কোনটির গায়ে শিমূল।

যৌথ পরিবার ভেঙে আজ টুকরো টুকরো অণু-পরিবার হয়ে গেছে, কিন্তু কত জল-ঝড়, বন্যা, খরা, ভূমিকম্প-সুনামি-আয়লার তাণ্ডবেও টিকে রয়ে গেছে এই পাহাড়-পরিবারটি। জেঠতুতো, মাসতুতো, খুড়তুতো, মামাতো পাহাড়-ভাইবোনেরা তাদের বন্ধুতায় রচনা করেছে এক প্রাকৃতিক নৈকট্য, এক নৈসর্গিক আনন্দ-সংসার। এই সংসারে নেই কোনো হিংসা-বিবাদ, স্বার্থ সংঘাত। শুধু আছে টিকে থাকার গর্ব আর অনাবিল, অকৃপণ দানশীলতা।

10

মুগ্ধ হলাম বিস্ময়ে। উঁচু, নীচু, ছোট, বড়দের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে কেবলই মনে হয়েছে, আহা যদি হিমালয়ের কাছাকাছি এরা থাকত তাহলে তুষারপাতের স্বর্গীয় সুখ পেত এরা! রডোডেনড্রনও বুঝি ঝরত এদের বুকে! বরফ গলা নদীর জলে ধুয়ে যেত এদের না পাওয়ার দুঃখ! গ্লেসিয়ারের তিরতির করে ঝরনার শব্দও শুনতে পেত এরা! পশ্চিম বাংলার এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক শুষ্কতা বুঝি এদের স্থৈর্য এবং ধৈর্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে তাই কালের প্রতিটি দন্ডে দন্ডে, পলে পলে এরা হয়ে উঠেছে মহাস্থবির জাতক। এক এক সময়ে মনে হল আমরা বুঝি কোনো গুপ্তধনের সন্ধান পেলেও পেতে পারি। কিছু পরেই কোনো এক পাহাড়ের শিলাখণ্ডে বিলীয়মান জীবাশ্ম দেখে থমকে গেছি। সেদিন পাহাড়ে দোল খেলছিল অনেকেই। পাহাড়-পরিবারের ইকোসিস্টেম কিছুটা অশান্ত হলেও প্রকৃতির দোল আর দোলের প্রকৃতি পাহাড়কে আরো রঙীন করেছিল। মাঝেমাঝেই কানে ভেসে আসছিল “হোলি হ্যায়” এর উত্তেজনা। আমার কেবলই মনে হচ্ছিল একটু জল অনুষঙ্গের কথা। জল-পাহাড় একসাথে জমে যায় সবখানে, সবকালে।

11

মনে পড়ল সত্যজিতের গুপীবাঘাকে। উঁচু পাথরের ওপরে দাঁড়িয়ে বারেবারে ওরা হাতে তালি দিয়েছিল আর বলেছিল শুণ্ডি! ভাবলাম দেখি যদি তালি দিয়ে শুণ্ডি বলে পৌঁছে যেতে পারি রাজার কাছে। বর্ষায় না জানি কত সবুজ মসেরা কার্পেট পেতে রাখে এই পাথরে! কত কোঁকড়াচুলের ফার্ণ-সুন্দরীরা হাত নেড়ে অভিবাদন জানায় ট্যুরিস্টদের। না থাকুক সিকিমের অর্কিড, রডোডেন্ড্রন, ম্যাগনোলিয়ারা। আমার বাংলার বসন্তের হাওয়ায় কৃষ্ণচূড়া-পলাশ পাপড়ি তো আছে এদের আশেপাশে। আর আছে সজনে আর নিমফুলের গন্ধ বাতাস। এই নীল নির্জনতায় তারা আছে তাদের মত, মিলেমিশে, এক হয়ে। পাহাড়ের উল্টোদিকে কিছুদূর গেলেই “নীল-নির্জন” ড্যাম যা একটি ট্যুরিষ্ট স্পটও বটে।

পাহাড়দের সাথে আলাপ-পরিচয় সেরে দেখে নিলাম পাহাড়েশ্বর শিবলিঙ্গ। সেদিন ছিল দোলপূর্ণিমা। রঙিন আবীরে পাহাড়েশ্বর ছিলেন জাগ্রত। এক মজার দোল খেলা হল তাঁর সাথে। ফেরার পথে স্থানীয় মানুষদের জিজ্ঞাসাবাদ করে মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই হাজির হলাম হেতমপুর রাজবাড়ির সামনে।

12

প্রকাণ্ড প্রবেশদ্বার। ঠিক যেন লন্ডনের পুরোনো কলেজগুলোর স্টাইলে তৈরী। লাল রঙের ইঁটের দেওয়াল, মধ্যে মধ্যে কালো আর হলুদ বর্ডার। ডি.এ.ভি. স্কুলকে দানপত্র করে দিয়েছে রাজবাটির এস্টেট। আর অন্দরমহলে এখন ইস্কুল বসে টেন প্লাস টু… প্রকান্ড বাগান-চত্বরে অকেজো, অনাদৃত পাথরের ভাঙা ফোয়ারা, ভাঙা পরীদের চাঁদের হাট, মধে মধ্যে নিমগাছ। রাজবাড়ির কিছুটায় রয়েছে রবীন্দ্র-নজরুল সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। তবে সত্যি সত্যি একদিন যে রাজকীয়তায় আচ্ছন্ন ছিল এই অঞ্চল তা এখানে পা দিয়েই বোঝা গেল। পাশেই একটি মন্দির রয়েছে আর কিছু দূরেই হেতমপুর কলেজের ছাত্রাবাস চোখে পড়ল। রাজবাড়ির প্রধান ফটক দিয়ে আমাদের গাড়িটি বেরিয়ে আসার সময় আমি বাইরে নেমে একটা ছবি নিলাম। মনে হল কেউ যেন আমাকে পেছনে ডেকে বলল, “কোথা থেকে আসা হল বললে না তো! ভালো লাগল, তবু তোমরা এলে বলে! আবার এসো কিন্তু!”

13



download




4 Responses to “চেনা পথ, অচেনা কথা – Travelogue by Indira Mukerjee”

  1. Ushnish Ghosh says:

    Khub bhalo Laglo PoDe…anek smriti joDi-e achhe ..amar sosur baDi-r deshe..Mon-e poDchhe…ekbar picnic e giye chhilam , chhoto mey-r takhon 6-7 bachhar boyesh…Raj-Poribar-er kichhu lok ese chhilen Kolkata theke..amader ghuriye dekhalen anek collection..hatat amar chhoto mey ek jon ke jigyasa ko-re boslo..” Tumi ki Rani?” ha ha

  2. kaustubhad says:

    শান্তিনিকেতনের পথে দুয়েকবছর আগেই ঘুরে এসেছিলাম। বেশ ভালো লেগেছিল। আপনার লেখাটাও তেমনই ভালো লাগল।

  3. debasis says:

    মনোগ্রাহী লেখা।
    ভালো লাগলো।

Leave a Reply

WP Like Button Plugin by Free WordPress Templates