চিঠি নিয়ে যত আলোচনা খুঁজে পাওয়া যায়, সেগুলো মনে হয় মোটামুটি তিন রকমের – ব্যাকরণভিত্তিক, সাহিত্যভিত্তিক, আড্ডাভিত্তিক। ব্যাকরণের ‘ব্যা’-করণ থেকে স্কুল ছাড়লেই অব্যাহতি পাওয়া যায়, কিন্তু সারাজীবন মেনে চলতে হয়, কারণ হাজার হোক অফিসের বসকে ‘মাই ডিয়ার’ বলা চলে না। সাহিত্যভিত্তিক আর আড্ডাভিত্তিকের তফাৎটা একটু সূক্ষ্ম। প্রথমটা সাহিত্যের রঙে একটু রঙ্গীন বাবু, দ্বিতীয়টি মুখের ভাষার পোশাকে আম-আদমি। প্রথমটা পত্রলিখনকে সম্ভ্রমের চোখে দেখে, দ্বিতীয়টা চিঠি লেখাকে ঠেক দেওয়ার আমেজে নিয়ে যায়। আমি আমার এই পরিসরে আড্ডার স্বাদই পরিবেশন করতে চাই।
আমার ছেলেবেলা কেটেছিল গ্রামের বাড়িতে। চিঠি ছিল প্রিয়জনের সাথে যোগাযোগের একমাত্র গতি। তখন মামাবাড়িতে দাদুকে যখন চিঠি লেখা হত, বায়না করতাম, আমিও একটু লিখি। পোস্টকার্ডের একটুখানি কোন কোণে, যথোচিত সম্বোধনে, মায়ের নিজের বয়ানে একলাইন হয়তো লিখতে পেতাম। কিন্তু তা-ই ছিল কত না আনন্দের বিষয়। আর যখন উত্তর আসত, তখন আমার জন্য একটু লেখা থাকলেই কৃতকৃতার্থ হতাম। আমি তো আম-আদমি, স্বয়ং রবি ঠাকুর, যাঁর চিঠিগুলি সাহিত্যকীর্তির অনুপম নিদর্শন, তাঁকেও জীবনে প্রথম চিঠি লিখতে হয়েছিল তাঁদের বাড়ির এক কেরানীর নির্দেশ অনুসারে। সবাই অবশ্য রবি ঠাকুরের বাবা নন যে কচি হাতের লেখার উত্তর দেন। কারণ কচিকাঁচারা প্রথম চিঠি লিখতে গিয়ে অনেক মজার মজার ভুলও করে ফেলে। মনে পড়ে, এরকমই এক অপোগণ্ড প্রবাসী বাবাকে চিঠি লিখেছিল, “ছাগলছানাটি বড় হয়েছেন। কচি কচি ঘাস খেয়ে মা দু’বার বমি করেছে দাদার মুখে। শুনবে আমরা ভালো আছি। ইতি – ”। গণ্ডগোলটা যে যতিচিহ্নগত, তা আশা করি পাঠক বুঝবেন। যখন ক্লাস ফাইভে আমার সুদীর্ঘ বারো বছরের ছাত্রাবাস জীবনের শুরু হল, তখন একটা প্রাপ্তি ছিল চিঠি লেখার স্বাধীনতা। আগ্রহের আতিশয্যে প্রতি রবিবার চিঠি লিখতাম বাড়িতে।
কিন্তু এ কথাও স্বীকার করতে হয় যে, স্বনির্ভর হওয়ার সাথে সাথে চিঠি লেখাটা ‘কর্তার ইচ্ছায় কর্ম’ হয়ে দাঁড়ায়। তখন বিষয়বস্তু আর চিঠির প্রাপক চিঠির গুরুত্ব নির্ধারণ করে। একটা কথা মানতেই হয় চিঠি লেখার প্রারম্ভিক ল্যাঠা প্রচুর। পোস্টঅফিস যাও রে, খাম বা পোস্টকার্ড কেনো রে, লিখে আবার সেখানেই ফেলে এস রে। তাগিদ যদি গুরুতর হয়, তবে সেটাই এতটা ‘কসরত’ করিয়ে ছাড়ে। যেমন – কাজের অবসর, বা অন্য কোনো ‘অফিশিয়াল লেটার’। নইলে মনে বলে ‘লিখ’, আর হাতে ধরে খিল। অতীতে উপায়ান্তর ছিল না বলে লোককে যে’রকম চিঠি লেখার আয়োজন করতে হত, তা একটা আলাদা রম্যরচনার বিষয়। ‘বাংলাদেশের হৃদয় হতে’ বইটাতে এরকমই একটা ছবি আছে। কয়েক ক্রোশ হেঁটে পোস্টকার্ড কিনে এনে চিঠি লিখে শেষে দেখা গেল যাঁকে লেখা হচ্ছে তিনি বিগত হয়েছেন। আমাদের এক শিক্ষকের ছাত্রাবস্থার এক অভিজ্ঞতার কথা বলি। তাঁর বন্ধু পুজোর দশমীর পর কলকাতা থেকে বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামে তার বাবাকে বিজয়ার প্রণাম জানিয়ে জাঁকালো এক চিঠি লিখবে মনে করেছিল। কিন্তু আটদিন ধরে সে কেবল রাতে মনে করে, আর সকালে ভুলে যায়। শেষে তার চিঠির বয়ান হয়েছিল –
“পূজনীয় বাবা,
টাকা পাঠাইয়া প্রণাম গ্রহণ করিবেন।
বিশেষ আর কী?
ইতি – ”
এ-প্রসঙ্গে বলা ভালো, জর্জ বার্নার্ড শ তাঁর বইয়ের কাটতি সম্পর্কে প্রকাশককে চিঠি দিয়েছিলেন, “?”, আর প্রকাশকের উত্তর ছিল “!”, অর্থাৎ ‘দারুণ’!
অনেক সময় আবার চিঠি লেখার থেকে চিঠি ‘ড্রপ’ করা বিষম জ্বালা। এক ভদ্রলোক তাঁর প্রতিবেশীকে সকালবেলা একটি চিঠি ‘পোস্ট’ করতে অনুরোধ করেছিলেন। সন্ধ্যেবলা দেখা হতেই জিজ্ঞাসা করেন, “ফেলেছেন তো?” প্রতিবেশীর রাগত উত্তর, “এত অবিশ্বাস! নিজের চিঠি নিজেই ফেলুন তাহলে।” এই বলে সেই চিঠি আবার ফিরিয়ে দেন। আরেকজন তাঁর বন্ধুকে জন্মদিনের আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি দিয়েছিলেন। ঐ বিশেষ দিনে তাঁর বন্ধু খালি হাতে তাঁর বাড়িতে এসেছেন। বন্ধু কথার পিঠে জিজ্ঞাসা করেন, “আজ তোমার বাড়িতে কীসের ধুম?” প্রথম ভদ্রলোক তখন দেখেন তাঁর লেখা চিঠি বুকপকেট থেকে আর বের হয়নি। পোস্ট করবেন বলে বেরিয়ে তারপর তিনি কোথায় গিয়েছিলেন, বহু চেষ্টা করেও তিনি মনে করতে পারেননি। আরেকজন তো ঠিকানা লিখে বয়ানটা ধীরে ধীরে লিখবেন ভেবেছিলেন এবং বয়ানটা মনেই রেখে ফাঁকা চিঠি পোস্ট করেছিলেন। আমি নিজে অনেকসময় এক মাস আগের তারিখ বসিয়েছি।
কিন্তু অনেক সময় চিঠি লেখায় প্রাণের টান কলমের টানের থেকে বেশি হয়। যেমন, প্রেমপত্র। লিখতে যেমন লাগে সময়, তেমন লাগে কল্পনা। তবু একটা নমুনা, “আমাদের এই প্রেম টিসকো স্টীলের মত শক্ত, ফেভিকলের জোড়ার মত অটুট। আশা করি, বামফ্রণ্টের মত দীর্ঘজীবী হবে।” তবু প্রাণের তৃষা থামে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এক সৈনিক তাঁর স্ত্রীকে হাজারখানেক চিঠি দিয়েছিলেন।
অনেকের আবার চিঠি লেখার বাতিক থাকে। জনৈকের অভিজ্ঞতা – তাঁর এক শিক্ষক সহকর্মীকে কলেজের অধ্যক্ষ কমপক্ষে বিশ’টা ‘কমপ্লেইন লেটার’ লিখেছিলেন। সেই সহকর্মীর সখেদ উক্তি ছিল, “জানেন, একেক সময় মনে হয়, আপনারা যাঁরা কমপ্লেইন লেটার দেখেননি, তাঁদের জন্য এগুলো এক্জিবিট করি।” ভদ্রলোকের প্রশ্ন, “করেননি কেন?” সহকর্মীর নির্বিকার উত্তর, “ইংরাজীটা বড্ড ভুল যে!” ফ্রান্সের এক রাজা তাঁর প্রবাসী বখাটে ছেলেকে উপদেশ দিয়ে নিয়মিত চিঠি লিখতেন, এবং ছেলেটি বিন্দুমাত্র বিরক্ত না হয়ে আরো উপদেশ চাইত। আসলে সে যা করত, তা হল, অটোগ্রাফ শিকারীদের বাবার চিঠি বেছে দিত। রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্রের অনেক চিঠি সেই মুহূর্তের মানসিক অবস্থার বিবরণ মাত্র, তবু বাতিক থামেনি।
এ তো গেল লেখকের জ্বালার কথা। প্রাপকের জ্বালার কথাও কম না। অনেকের হাতের লেখা বুঝে চিঠি পড়া এতই দুর্ঘট যে মনে হয় চিঠির সাথে লেখককে পোস্ট করা উচিত ছিল। শুনেছিলাম সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র দীনবন্ধু মিত্রকে এক চিঠি লিখেছিলেন। সেটা না বুঝতে পেরে দীনবন্ধুবাবু একটা কাগজে হিজিবিজি এঁকে পাঠিয়েছিলেন। অনেকের চিঠি লেখার বাতিকের ঠেলায় অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে প্রাপক। এরকম একজন উত্তর দিয়েছিল, “যদি পার, এবারে বরং নিজেকে চিঠি লেখা অভ্যাস করো।” আবার অনেক প্রাপক চিঠি কদর দেন। যেমন এক ভদ্রলোকের অভ্যাস ছিল, চিঠি উল্টো করে ধরে পড়া। কারণ জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, “যিনি লেখেন, অনেক কষ্ট করে লেখেন। তাঁর শ্রম মাঠে মারা যেন না যায়, তাই উল্টো করে পরি, যাতে তাড়াতাড়ি শেষ না হয়।”
আমার এই পত্র-পাঁচালির অনেকটা পথ পেরিয়ে এবার থামতে হয়। থামার আগে একটা কথা বলে যাই যে চিঠি লেখা হয়ত কাগজের ওপর হাতে লেখাতে অবলুপ্ত হতে চলেছে, কিন্তু আবার নতুন রূপে প্রকাশ পেতে চলেছে ই-মেলের মাধ্যমে। তাকে নতুন নামে ডাকছি, কিন্তু সে ঐ একই কাজ আরো দ্রুত করছে। কিন্তু আবার এ কথাটাও সত্য, কলমটা ধরে কাগজের ওপর প্রাণের ভাষা লিখলে তাতে হৃদ্যতার পরশ যতটুকু থাকে, ইমেলে কি সেই আবেগ পাওয়া যায়? আবেগটা কেমন জোলো হয়ে যায়। আবার এটাও হতে পারে, সে আবেগ নতুন রকমে আসে, তাকে ধরতে গেলে একটু আলাদা দৃষ্টিভঙ্গী চাই।
সবাই হয়তো বলবেন, সারাটা লেখার মধ্যে অন্যদের কীর্তির কথাই বেশী বললাম, আর শেষে বিজ্ঞের মত নিজের মতামত দিয়ে শেষ করছি, যেন আমি এ ব্যাপারে কত বড় ওস্তাদ। তাই বিদায়ের আগে আমার একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি, যেটা কেবল চিঠি লেখার মাধ্যমেই করতে পেরেছিলাম। একবার কোনো এক কনকারেন্স-এ যোগ দেওয়ার জন্য উদ্যোক্তাদের চিঠি লিখতে হয়েছিল। ব্যাপারটা বিরক্তিকর, তার ওপর কাকে সম্বোধন করব খুঁজে পাই না। তাড়াতাড়িতে কনফারেন্স ওয়েবসাইট থেকে একটা নাম জেনে তাঁকে উদ্দেশ করেই চিঠি লিখলাম। চিঠির উত্তর এলো, “আপনার আগ্রহ দেখে আমরা আপ্লুত। তবে আপনি যাঁকে সম্বোধন করেছেন, তিনি পাঁচ বছর আগেই গত হয়েছেন, এবং তাঁর স্মরণেই এই কনফারেন্স। দয়া করে ওয়েবসাইট-টা ভালো করে পড়বেন।”
স্বর্গীয় সুভাষ চক্রবর্তীর উক্তি ছিল, “মরা মানুষ বাঁচানো ছাড়া আর সব কাজই আমি পারি।”
আর বর্তমান লেখক?
“মরা মানুষ বাঁচাইয়া প্রমাণ করিলেন তিনি কীরূপ কর্মী।”
সব্যসাচীকে পালকিতে স্বাগত। লেখার ধাঁচে একটা, সম্ভবত ইচ্ছাকৃত, ক্লাসটেনের রচনা বইয়ের আধা-সাধু ভাষার ছাপ আছে। সেই সময়েই আমাদের এসব পত্রটত্র লেখাও অভ্যেস করতে হত কিনা বাংলা দ্বিতীয় পত্রে। তাই আমেজটা বেশ লেগেছে। লেখাটাও উপভোগ্য, বিশেষ করে লেখকের ব্যক্তিগত অ্যানেকডোটটা মজা বাড়িয়েছে।