আজ যে লোকটার গল্প তোমাদের বলব, সে থাকত রুমানিয়া বলে এক দেশে। সে এতো ধনী ছিল যে সে যদি একটা পুরো সপ্তাহ ধরে তার সমস্ত টাকা পয়সা দিনরাত গুনতে থাকত তবুও সে সব কিছু গুনে শেষ করতে পারত না। তোমরা ভাবছ, যে এতো অর্থ যার, সে নিশ্চয়ই খু–ব সুখী। কিন্তু না, সে খুবই কষ্টের মধ্যে দিন কাটাত। ভাগ্যদেবী তাকে এতো আশীর্বাদ ঢেলে দিয়েছেন, রাশি রাশি ধন দিয়ে সে তো জীবনের কতো আনন্দ উপভোগ করতে পারতো; কিন্তু তার বদলে সে সর্বদাই মৃত্যুচিন্তায় কাতর থাকতো। সমস্ত ধন-সম্পত্তি পেছনে ফেলে মরে যাওয়াটা তার কাছে ভয়াবহ মনে হত।
শেষ পর্যন্ত সে আর এই যন্ত্রণা সহ্য করতে পারল না। সে সমস্ত পৃথিবী ঘুরে এমন একটি দেশের সন্ধানে বের হল যে দেশে কেউ কখনো মরেনি। বহু বছর ধরে সে ঘুরে বেড়ালো; অনেক বিচিত্র দেশে সে গেলো। কত লোকে তাকে হেনস্থা করল; যারাই তার অনুসন্ধানের উদ্দেশ্য শুনল, তারাই তাকে নানা ভাবে ঠাট্টা করতে লাগল। কিন্তু সে দমল না। অবশেষে সে এমন এক দেশে আসলো যেখানে মৃত্যু শব্দের অর্থটাই অজানা ছিল। সে তো তার ভাগ্যকে বিশ্বাসই করতে পারছিল না। এরকম একটা দেশের অস্তিত্ব যে থাকতে পারে – সেই আশাটাই তো সে হারিয়ে ফেলছিল। সে লোকজনদের জিজ্ঞাসা করল,
“কিন্তু এখানে যদি কেউ না মরে, তবে তো তোমাদের দেশে সবসময়ই আরো, আরো লোকের ভীড় বাড়ছে।”
“একদমই নয়,” তারা উত্তর দিল, “কোন একটা সময় আমাদের প্রত্যেকেই শোনে একটা স্বর তাকে ডাকছে। যখন কেউ সেই স্বরকে অনুসরণ করে, সে আর ফিরে আসে না।”
“তাই নাকি!” ধনী লোকটা ভাবল, “আরে, আমি ওদের মত এতো বোকা কখনও হব না। আমি একটা সাধারণ স্বরকে কখনই অনুসরণ করবো না।”
এই দেশটাকে পেয়ে সে এতো খুশী হল যে সেই দেশে সে পরিবার নিয়ে থাকতে শুরু করল। এতদিনে সে মৃত্যুকে ফাঁকি দেবার একটা রাস্তা খুঁজে পেয়েছে। স্ত্রী-পুত্রদের নিয়ে তার একটু অস্বস্তি রয়েই গেল; তার মত বুদ্ধি যদি ওদের থাকত! তাই সে তাদের বারবার সাবধান করে হুকুম করল, যদি তারা শোনে কোনো স্বর তাদের ডাকছে, তারা যেন কোনোমতেই সেই স্বরকে অনুসরণ না করে।
বছর গড়ায় আর লোকটা ধীরে ধীরে ভাবতে শুরু করে যে সে মৃত্যু থেকে নিরাপদ। তারপর একদিন রাত্রে তারা সবাই যখন আগুনের পাশে গোল হয়ে বসেছিল, হঠাৎ তার স্ত্রী নিজের চেয়ার থেকে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল; তার কোল থেকে হাতের সেলাই মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল। চেঁচিয়ে উঠে সে বলল, “ঠিক আছে, আমি আসছি, আমি আসছি!” আর দেয়ালের আংটা থেকে নিজের ফার-কোটটা নিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। বাইরে তখন বরফ-ঝরা দারুণ শীতের রাত্রি।
লোকটা ভীষণ উত্তেজিত হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “একী, তোমার মনে নেই তোমায় আমি কী বলেছিলাম?” ভয়ে তার গলাটা কাঁপছিল। “যদি মরতে না চাও, তবে যেখানে আছো সেখানেই দাঁড়াও।”
মহিলাটি বলল, “তুমি কি শুনতে পাচ্ছো না একটা স্বর আমাকে ডাকছে? এক মিনিটের জন্য বাইরে গিয়ে যদি দেখতে পেতাম কে আমাকে এত ব্যাকুলভাবে ডাকছে।” স্বামীটি অনেক যুক্তি দিয়ে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করল যে এটা হল মৃত্যুর নতুন করে আরেকটা শিকার জোগাড় করার ফন্দী। কিন্তু স্ত্রী মানল না। সে দেখল স্বামীর সঙ্গে এতো তর্ক করে লাভ নেই; সে বলল, “আমি তোমার কথাই মানলাম। আমাকে আমার ফারকোটটা পড়তে দাও, কারণ হঠাৎ আমার হাড় পর্যন্ত হিম করে শীত করছে।”
যাক, শেষ পর্যন্ত সে বৌ-এর হুঁশ ফেরাতে পেরেছে, এই ভেবে লোকটি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে কোটটা তার হাতে দিল। কিন্তু কোটটা পড়েই বৌটা ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। তার স্বামী সঙ্গে সঙ্গে তার পিছনে দৌড়ে গিয়ে তার কোটটা ধরে ফেলল, কিন্তু কোটটা রয়ে গেল স্বামীর হাতে আর বৌটি মিশে গেল অন্ধকারে। লোকটি শুধু তার চিৎকার শুনতে পেল, “আমি আসছি, আমি আসছি।” শীঘ্রই মহিলাটির গলা নৈঃশব্দের মধ্যে মিলিয়ে গেল আর কেউই তাকে কোনোদিনই দেখতে বা তার গলা শুনতে পায়নি।
ধনী লোকটি তার বৌকে খুবই ভালোবাসত। তাই সে কিছুদিন বেশ বিষণ্ণ হয়ে রইল। একা হলেই সে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ভাবতো, “এতোবার করে সাবধান করলাম, এতো অনুনয় করলাম, তবু বৌটা আমার কথা কিছুতেই শুনল না! বোকা মেয়েটা নিজের দোষেই বেঘোরে প্রাণটা হারাল। কিন্তু মৃত্যু আমায় এতো বোকা বানাতে পারবে না।”
দিনতো কারো জন্য বসে থাকে না। ধনী মানুষটিরও দিন ভালোভাবেই গড়িয়ে যেতে লাগল। ছেলেমেয়েরা মনের মত করে বড় হয়েছে, লেখাপড়া করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যে ধন সে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল, তা বহুগুনে বৃদ্ধি পেয়েছে। স্ত্রী-বিয়োগের কষ্ট বাদ দিলে এখন সে একজন সফল তৃপ্ত মানুষ। প্রতি সকালে সে প্রাতরাশ শেষে নাপিতের জন্য অপেক্ষা করে। নাপিত এসে তার চুল-দাড়ি কেটে পরিষ্কার করে দিলে সে স্নান করে কাজে বেড়িয়ে পড়ে।
সেদিনও সে তার চেয়ারে বসেছিল আর নাপিতও তৈরী হচ্ছিল; হঠাৎ দেখা গেল ধনী লোকটির মুখ রাগে আর ভয়ে লাল হয়ে উঠছে। সে লাফ দিয়ে উঠে চিৎকার করে বলতে লাগল, “আমি আসব না, কখনই আসব না!” নাপিতটি অবাক হয়ে চারদিকে তাকাতে লাগল, একি, ঘরে তো কেউ কোত্থাও নেই! লোকটা আবার চেঁচিয়ে উঠল, “আমি তোমায় শেষবারের মত বলছি আমি যাব না। তাই বেরোও এখান থেকে।” হঠাৎ সে নাপিতের হাত থেকে খোলা ক্ষুরটা ছিনিয়ে নিয়ে ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। সকলে শুনল সে দৌড়াতে দৌড়াতে চিৎকার করছে, “যতই তুমি ডাকো না কেন, আমি আসব না। কিন্তু দাঁড়াও, আমি তোমায় ধরবই। আর এমন শিক্ষা দেব যে বাকি জীবনের জন্য তুমি আমার কাছে আর আসবার সাহসই পাবে না।”
খোলা ক্ষুর হাতে পাগলের মত চিৎকার করতে করতে লোকটা দৌড়ে পার হয়ে যেতে লাগল শহরের রাস্তা-ঘাট এবং তারপর বরফ বিছানো পাহাড়গুলি। আর তার পিছনে দৌড়াতে লাগল সেই নাপিতটা কারণ ক্ষুরটা যে তারই। দুজনের মধ্যে ব্যবধান যখন বেশ কমে এসেছে হঠাৎ ধনী লোকটা অদৃশ্য হয়ে গেল। নাপিতটি কোনোরকমে নিজেকে সামলে দাঁড়িয়ে পড়ল। যে উঁচু পাহাড়চূড়া থেকে লোকটা পড়ে গিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল, আরেকটু হলে তারও ওই একই দশা হত। সে অবশ্য গুঁড়ি মেরে উঁকি দেবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু লোকটা একেবারে অদৃশ্য। কোথাও তার এতোটুকু চিহ্নমাত্রও নেই।
স্লথ পায়ে নাপিত ফিরে এল শহরে তার দোকানে। শহরের লোককে সে সব ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিতে লাগল। সকলেই ঘাড় নাড়ল, কারণ এটা তো জানা কথাই যে সেই রহস্যময় স্বরকে যে-ই অনুসরণ করেছে, সে-ই মাটির এক অতলস্পর্শী খাদে পড়ে মৃত্যুবরণ করেছে। কিন্তু, কৌতূহল বড় বিষম ব্যাপার। এটা মোটামুটি সকলের মধ্যেই থাকে, কিন্তু কারো কারো কৌতূহল আবার অন্যদের থেকে কিঞ্চিৎ বেশী। তাদের খালি মনে হতে লাগল, যে জায়গাটা তাদের শত্রু-মিত্র এতো বিপুল পরিমাণ লোককে গিলে ফেলেছে, না জানি সে জায়গাটা কেমন! তারা নাপিতকে ধরে পড়ল সেই জায়গায় নিয়ে যাবার জন্য।
নাপিত তো সেই জায়গাটা চেনে। তাই সে খুব প্রত্যয়ের সঙ্গেই তাদেরকে নিয়ে গেল সেই জায়গায়। কিন্তু ও হরি! একদল মানুষ পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে দেখল কোথায় গহ্বর, কোথায় কি! সামনে পড়ে রয়েছে এক দিগন্তবিস্তৃত সমতলভূমি।
সেইদিন থেকে রুমানিয়ার মানুষজন, ঠিক যেভাবে অন্য সব জায়গায় লোকেরা সাধারণভাবে মরে, সেভাবেই মৃত্যুবরণ করতে লাগল।